বিজ্ঞান ও কুসংস্কার প্রবন্ধ রচনা:
ভূমিকা:
বিজ্ঞান এবং কুসংস্কার,দুটি শব্দই বিপরীত ধারার ধারণা বা বিশ্বাসকে চিহ্নিত করে।বিজ্ঞান হল মানুষের যুক্তি,গবেষণা এবং পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান, যা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং প্রমাণিত। অপরদিকে, কুসংস্কার হল অযৌক্তিক, অপ্রমাণিত বিশ্বাস,যা মানুষের আবেগ বা পরিবেশগত প্রভাবের কারণে তৈরি হয়। বিজ্ঞান মানুষের চিন্তা ও বোধের উন্নতি ঘটায়, তবে কুসংস্কার মানব সমাজকে বিপথে পরিচালিত করে। এই প্রবন্ধে বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের সম্পর্ক, তাদের সমাজে প্রভাব এবং কিভাবে আমরা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠন করতে পারি, তা আলোচনা করা হবে।
১. বিজ্ঞানের অগ্রগতির:
বিজ্ঞান হল জ্ঞান আহরণের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া,যা পরীক্ষামূলক অনুসন্ধান,তত্ত্ব এবং যুক্তি দ্বারা গঠিত। বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতি ও পৃথিবীর কাজ করার পদ্ধতি বুঝতে পারা এবং তা নিয়ে নতুন নতুন আবিষ্কার করা।আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের জীবনের প্রতিটি দিককে পরিবর্তন করেছে।চিকিৎসা,প্রযুক্তি,যোগাযোগ, পরিবেশবিজ্ঞান,মহাকাশ গবেষণা-প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে।
যেমন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আমাদের জীবন রক্ষা করেছে বহু রোগের প্রতিকার এনে। শতাব্দী ধরে মানুষের জীবনের অমূল্য অঙ্গ ছিল প্রাচীন জ্ঞান, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন পদ্ধতি দিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান করেছে।
বিজ্ঞানের বিকাশের ফলে মানুষের মানসিকতা ও পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। সেকালে মানুষ ভাবত পৃথিবী সমতল, আকাশের দেবতা পৃথিবীকে রক্ষা করছেন, কিন্তু আজ আমরা জানি পৃথিবী গোলাকার এবং পৃথিবী সম্পর্কে আরও নিখুঁত বিজ্ঞানসম্মত ধারণা আমাদের রয়েছে।
২. কুসংস্কার:
কুসংস্কার হলো এমন একটি বিশ্বাস, যা যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বাইরে চলে যায়। এটি সাধারণত পুরনো সংস্কৃতি, রীতিনীতি বা অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। কুসংস্কারের মধ্যে এমন কিছু বিশ্বাস থাকতে পারে, যেমন– বিশেষ কিছু সংখ্যা বা দিনে কিছু কাজ করা অশুভ, বা একটি নির্দিষ্ট পশুর দেখাও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কুসংস্কারের উপস্থিতি প্রাচীনকাল থেকে দেখা যায়। ভারতবর্ষে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনো বহু মানুষ কুসংস্কারের শিকার। তারা বিশ্বাস করে,পূর্ণিমার রাতে যেকোনো ধরনের কাজ করলে বিপদ আসবে,কালো বিড়াল দেখলে বিপদ হতে পারে, কিংবা কিছু নির্দিষ্ট দিন বা সময়ের মধ্যে বিশেষ ধরনের কাজ না করার জন্য নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এগুলি সবই অযৌক্তিক,পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত নয় এবং এসবের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।
৩. বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের সংঘর্ষ:
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার একে অপরের পরিপূরক নয়, বরং একে অপরের বিরোধী।যখন বিজ্ঞান মানুষের বোধ ও জ্ঞানে উন্নতি আনে,তখন কুসংস্কার মানুষের চিন্তাভাবনা ও আচরণকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। কুসংস্কারের প্রভাবে মানুষ বিজ্ঞানকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে এবং নানান অযৌক্তিক বিশ্বাসের দিকে ঝোঁকতে থাকে।
বিজ্ঞান যেমন মানুষকে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা দেয়, তেমনি কুসংস্কার মানুষের চিন্তা ও মননের স্বাধীনতা খর্ব করে। উদাহরণস্বরূপ, এক সময়ে মহামারির সময় কুসংস্কারের শিকার হয়ে অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে,কারণ তারা চিকিৎসার পরিবর্তে অযৌক্তিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস করত। বিশ্বব্যাপী প্লেগ,কলেরা ও অন্যান্য মহামারি পরিস্থিতিতে বিজ্ঞান যেখানে উপযুক্ত চিকিৎসা ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছে,কুসংস্কারের ফলে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
৪. কুসংস্কারের সমাজিক প্রভাব:
কুসংস্কার সমাজে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করে এবং মানুষের মধ্যে অযথা ভয়, সন্দেহ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।সমাজে কুসংস্কারের কারণে ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।একসময় নির্দিষ্ট জাতি বা শ্রেণির মানুষের প্রতি কুসংস্কারের ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল। তেমনি নারী, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের অনেক দেশে কুসংস্কারের শিকার হতে দেখা গেছে।
কুসংস্কার মানুষের মন ও সমাজের শান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এর বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।যেমন, বাংলাদেশে গর্ভপাত বা সন্তান হত্যার মতো সামাজিক সমস্যা বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ও শিক্ষা দ্বারা সমাধান করা যেতে পারে, যেটি কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়তে সহায়ক হবে।
৫. কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ার উদ্যোগ:
কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ার জন্য আমাদের প্রথমে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এর জন্য বিজ্ঞান শিক্ষা, মানসিকতা পরিবর্তন ও সর্বোপরি সমাজের মধ্যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। আজকের দিনে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো সম্ভব।
প্রাথমিক স্তরে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম বিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং তারা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে। গণমাধ্যম, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং বিজ্ঞানী- এই সব শ্রেণি কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
৬.উপসংহার:
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার একে অপরের শত্রু। বিজ্ঞান মানুষের চিন্তা ও বোধের উৎকর্ষ ঘটায়, আর কুসংস্কার সমাজকে অন্ধকারে রেখে দেয়। আধুনিক যুগে বিজ্ঞান মানুষের জীবনে যে অবদান রেখেছে, কুসংস্কারের প্রতি তার পূর্ণ সমালোচনা প্রাসঙ্গিক। কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হলে, প্রতিটি স্তরের মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে হবে। এর মাধ্যমে আমরা একটি উন্নত, সচেতন ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো, যেখানে কোনো ধরনের অযৌক্তিক বিশ্বাসের স্থান থাকবে না।
এভাবেই, যদি আমরা একে অপরের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব। বিজ্ঞান আমাদের ভবিষ্যৎ, এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেই আমাদের সমাজ ও জীবনকে সমৃদ্ধ করতে হবে।
আরো পড়ুন:
ডাবের জলে উপকারিতা click Here
দুধের উপকারিতা click here
ওজোন গ্যাস click here
রক্ত সম্পর্কে আলোচনা click here
অস্থি বা হাড়ের কার্যাবলী Click here
থাইরয়েড গ্রন্থির প্রশ্ন উত্তর Click here
প্রবন্ধ রচনা দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞান Click here
একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রবন্ধ রচনা click here
বাংলার উৎসব প্রবন্ধ রচনা Click here
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার প্রবন্ধ রচনা Click here
গাছ আমাদের বন্ধু প্রবন্ধ রচনা Click here
মেলা প্রবন্ধ রচনা Click here
মোবাইল ফোনের ভালো মন্দ প্রবন্ধ রচনা Click here
ধ্বনি ও স্বরধ্বনির প্রশ্ন উত্তর Click here
0 Comments