বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ প্রবন্ধ রচনা:
ভূমিকা:
বিজ্ঞান আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি এবং উন্নতির প্রধান চালিকা শক্তি। এর প্রভাবে মানবজাতি শিখেছে পৃথিবীকে কীভাবে জয় করতে হয় এবং প্রকৃতির নিয়মকে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়।বিজ্ঞান যুগে যুগে মানবসভ্যতাকে নানা দিক থেকে উন্নতি ও সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে। তবে বিজ্ঞান যেমন আমাদের জীবনে অসংখ্য সুবিধা ও উন্নতি এনে দিয়েছে, তেমনি তার অপব্যবহার এবং অযথা ব্যবহারও একাধিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, বিজ্ঞান আসলে আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?
বিজ্ঞান মানবজাতির উন্নতির জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত, বিজ্ঞান সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রা সহজতর হয়েছে,পৃথিবীজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুততর হয়েছে এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু,যদি সঠিকভাবে বিজ্ঞানের প্রয়োগ না হয় অথবা বিজ্ঞানকে অশুভ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে তা অভিশাপেও পরিণত হতে পারে। সুতরাং, বিজ্ঞান নিজে কোনো আশীর্বাদ বা অভিশাপ নয়, বরং এটি একটি শক্তি, যার প্রয়োগ এবং উদ্দেশ্যই তা নির্ধারণ করে।
১. বিজ্ঞানের আশীর্বাদ বা উপকারিতা:
বিজ্ঞান আসলে প্রথমে মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। তার প্রধান উপকারিতাগুলির মধ্যে অন্যতম হল- চিকিৎসা,যোগাযোগ,পরিবহন,কৃষি এবং শিল্প। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো চিকিৎসাশাস্ত্রে বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের অবদান। রোগের সঠিক কারণ এবং চিকিৎসার পদ্ধতি খুঁজে বের করা বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকরা সম্ভব করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান যেমন জীবনরক্ষা করেছে,তেমনি নানা রোগের প্রতিষেধকও আবিষ্কার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার মানুষের জীবনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। তেমনি ভ্যাকসিন এবং ক্যান্সারের চিকিৎসার মতো নানা অগ্রগতি মানবজাতিকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে।
বিজ্ঞান যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন এনেছে। আজকের দিনে সারা পৃথিবী মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন এবং অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে এক মুহূর্তে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে খবর পৌঁছানো সম্ভব। শিক্ষা, বাণিজ্য, শিল্প, স্বাস্থ্য – সবকিছুই বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সাহায্যে আরও গতিশীল এবং কার্যকরী হয়ে উঠেছে।
পরিবহন ব্যবস্থা বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের অবদানস্বরূপ এখন অনেক দ্রুত এবং সুবিধাজনক হয়েছে। আগেকার দিনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো, কিন্তু এখন আধুনিক যানবাহনের সাহায্যে আমরা একদিনেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে পারি। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
কৃষিতে বিজ্ঞান উদ্ভাবন করেছে নতুন নতুন প্রযুক্তি, যা কৃষকদের জন্য সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচ ব্যবস্থা, কীটনাশক ও জৈব সার, জেনেটিকালি মডিফাইড ফসল-এসব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদান। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন অনেক বেড়েছে, যা পৃথিবীজুড়ে দারিদ্র্য ও খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলা করতে সাহায্য করেছে।
২. বিজ্ঞান: অভিশাপ বা ক্ষতিকর প্রভাব:
যদিও বিজ্ঞান মানবসভ্যতার উন্নতি ঘটিয়েছে, তবে তার কিছু অপব্যবহারও হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য অভিশাপ হতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তির আবিষ্কারের কিছু দিক মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পরমাণু শক্তির ব্যবহার, বায়ু এবং জলদূষণ, প্রযুক্তির অপব্যবহার, এবং জৈব অস্ত্রের মতো সমস্যা বিজ্ঞানের অশুভ দিক।
একটি প্রধান উদাহরণ হলো পরমাণু বোমার ব্যবহার। পরমাণু শক্তির বিকাশ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও, এর বিধ্বংসী ক্ষমতার ব্যবহার মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে যে পরমাণু বোমা ফেলা হয়েছিল, তা আজও মানব ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়। এর মাধ্যমে অসংখ্য নির্দোষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল এবং আজও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের উপর এর প্রভাব পড়ছে। পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, তার শক্তি যদি অশুভ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অতি উন্নতির ফলে পরিবেশের উপরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বনভূমি উজাড়, বায়ু দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন-এসব হচ্ছে বিজ্ঞানের অপব্যবহারের ফলস্বরূপ। মানবসভ্যতার অগ্রগতির কারণে পৃথিবী একদিকে উন্নত হলেও অন্যদিকে প্রকৃতির ক্ষতি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি যেমন সুবিধা দেয়, তেমনি তার অপব্যবহারও ভয়াবহ হতে পারে। সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল তথ্য চুরি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘ
-এসবই প্রযুক্তির অপব্যবহারের উদাহরণ। বিভিন্ন ধরনের সাইবার আক্রমণ আজকাল মানুষের জীবনে এক নতুন ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। একারণে, প্রযুক্তির মধ্যে যে শক্তি রয়েছে,তা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার না করা হয়, তবে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।
৩. বিজ্ঞান: ভবিষ্যত এবং সঠিক ব্যবহার:
তবে বিজ্ঞান সবসময়ই মানুষের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হলে এটি এক ধরনের আশীর্বাদ হতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মানবজাতির ভবিষ্যত নির্ভর করবে তার সঠিক ব্যবহারের উপর। পরিবেশের সুরক্ষা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, এবং সামাজিক সমস্যাগুলির সমাধান বিজ্ঞানের সাহায্যে সম্ভব হতে পারে, যদি আমরা তার যথাযথ এবং সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করি।
বিজ্ঞান শুধু শক্তি নয়,এর পাশাপাশি দায়িত্বও থাকতে হবে। বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদদের উচিত তাদের কাজের ফলাফল সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং তাদের আবিষ্কারকে মানবতার জন্য কল্যাণকরভাবে ব্যবহৃত করার জন্য এক নৈতিক দায়িত্ব পালন করা। বিশ্ববাসীকে অবশ্যই বিজ্ঞানের উন্নতি এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সৃজনশীলতার মাধ্যমে মানবকল্যাণে মনোনিবেশ করতে হবে।
উপসংহার:
বিজ্ঞান নিজে কোনো আশীর্বাদ বা অভিশাপ নয়, এটি নির্ভর করে এর ব্যবহারের উপর। বিজ্ঞান মানব সভ্যতার উন্নতির জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, কিন্তু তার অপব্যবহার অভিশাপেও পরিণত হতে পারে। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দায়িত্বও বেড়েছে, যাতে এর প্রভাবে মানবজাতির কল্যাণ সাধিত হয় এবং প্রকৃতির উপর ক্ষতি না হয়। বিজ্ঞান যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, অন্যথায় তা অভিশাপও হতে পারে।
আরো পড়ুন:
ডাবের জলে উপকারিতা click Here
দুধের উপকারিতা click here
ওজোন গ্যাস click here
রক্ত সম্পর্কে আলোচনা click here
অস্থি বা হাড়ের কার্যাবলী Click here
থাইরয়েড গ্রন্থির প্রশ্ন উত্তর Click here
প্রবন্ধ রচনা দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞান Click here
একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রবন্ধ রচনা click here
বাংলার উৎসব প্রবন্ধ রচনা Click here
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার প্রবন্ধ রচনা Click here
গাছ আমাদের বন্ধু প্রবন্ধ রচনা Click here
মেলা প্রবন্ধ রচনা Click here
মোবাইল ফোনের ভালো মন্দ প্রবন্ধ রচনা Click here
ধ্বনি ও স্বরধ্বনির প্রশ্ন উত্তর Click here
0 Comments