মেলা- প্রবন্ধ রচনা:
ভূমিকা:
বাংলাদেশে মেলা একটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং দেশের সামাজিক জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেলা শুধু আনন্দ এবং বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠান যেখানে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন, বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। একদিন আমি আমার জীবনে এমন একটি মেলায় উপস্থিত হয়েছিলাম, যা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে এবং তা একদম মনের গভীরে স্থায়ী হয়ে গেছে।
আমার দেখা সেই মেলাটি ছিল একটি গ্রাম্য মেলা, যা প্রতি বছর একটি বিশেষ দিনে আয়োজিত হয়। ওই মেলা ছিল আমার বাড়ির কাছে একটি ছোট গ্রামের মাঠে। আজও সেই দিনটি আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল, যখন আমি প্রথমবার সেই মেলায় গিয়েছিলাম। মেলাটি ছিল এক ধরনের ঐতিহ্য, যা গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে।
মেলার পরিবেশ:
মেলা শুরু হয়েছিল সকাল থেকে, এবং সেখানে ঢুকতেই আমি অনুভব করলাম একটি আলাদা ধরনের উত্তেজনা। মাঠের মধ্যে অনেক স্টল সাজানো ছিল, সেগুলো বিভিন্ন প্রকার পণ্যে ভর্তি ছিল। কিছু স্টলে ছিল হস্তশিল্প, কিছুতে ছিল রং-বেরঙের জামা-কাপড়, কিছুতে ছিল শিশুদের খেলনা। বাচ্চারা আনন্দে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল এবং খেলনা কিনছিল। একদিকে ছিল মিষ্টান্নের দোকান, সেখানে নানা ধরনের মিষ্টি যেমন রসগোল্লা, সন্দেশ, পাকোড়া, বেগুনি ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছিল।
মেলার চারপাশে শোভিত ছিল নানা রকমের দোকান। বড় বড় হুইল চেয়ার, ঝুলন্ত ঝুলন্ত রাইড, এবং ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে চড়ানো ছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ। মেলা প্রাঙ্গণে ঢুকতেই নানান রঙের বাতি, সাজানো স্টল, হাহাকার, হট্টগোল আর আনন্দের মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছিল যেন এটি একটি স্বপ্নের দেশ।
মেলার এক কোণে ছিল সার্কাসের মঞ্চ। সেখানে একদল মানুষ তাদের সারা জীবনের কঠোর অনুশীলনকে রূপ দিয়েছিল। তারা ট্রাম্পলিনে লাফিয়ে, জাম্পিং, দড়ির ওপর হাঁটা, এমনকি আগুনের খেলা প্রদর্শন করছিল। মঞ্চের চারপাশে উপস্থিত মানুষের মুখে হাসি ছিল এবং শিশুদের চোখে ছিল অবিশ্বাস্য আগ্রহ।
মানুষের একতা ও বন্ধন:
মেলা শুধু কেনাকাটার জন্য নয়, বরং এটি একটি সামাজিক মিলনস্থল। সেখানে গ্রাম এবং আশপাশের এলাকার বিভিন্ন মানুষ একত্রিত হয়। সকল বয়সের মানুষ সেখানে আসে—যেখানে ছোট ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই মেলায় অংশগ্রহণ করে। মেলার পরিবেশে মানুষের মধ্যে এক ধরনের বন্ধন তৈরি হয়। আত্মীয়-স্বজনরা একে অপরকে দেখতে আসে, গল্প করে, পুরানো স্মৃতি ভাগাভাগি করে এবং নতুনদের সাথে পরিচিত হয়।
এদিন মেলাতে আমরা সকলেই একসঙ্গে সময় কাটিয়েছিলাম। পরিবারের সঙ্গে আমি যখন ঘুরছিলাম, তখন দেখতে পেলাম, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কটেজে বসে রঙিন খেলনা কিনছে, কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের নাচ-গান শিখছে। অনেকেই নিজের বন্ধুদের সাথে ক্যামেরায় ছবি তুলছিল এবং স্মৃতি ধরে রাখতে চেষ্টা করছিল।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান:
মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মেলার মাঝখানে একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান চলছিল। গায়ক, শিল্পী, নৃত্যশিল্পীরা তাদের কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে আসতেন। আমি একদিন মেলার মঞ্চে একটি প্রথাগত বাংলা গান শুনেছিলাম, যা একজন তরুণ গায়ক পরিবেশন করছিল। তার কণ্ঠে সুর ছিল যেন মেলায় উপস্থিত সকলকে একাকার করে দিয়েছে। আশেপাশে প্রচুর মানুষ বসেছিল এবং সবাই সেই গান শুনছিল। গানের মধ্যে যে অনুভূতি ছিল, তা খুবই হৃদয়গ্রাহী ছিল।
এছাড়া মেলায় একাধিক লোকনৃত্য, যেমন হাসন রাজা, আলী, লালন ফকিরের গানও ছিল। সংস্কৃতির এই অংশটি মেলাটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
মেলার ব্যবসায়িক দিক:
মেলা শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্রও বটে। গ্রামাঞ্চলে যে সমস্ত দোকানিরা তাদের পণ্য বিক্রি করতে আসে, তারা মেলায় তাদের পণ্য প্রদর্শন করতে পারে। মেলায় ছোট-বড় দোকানগুলো বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য বিক্রি করে—কিংবা স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যগুলি উপস্থাপন করে। কেউ শাক-সবজি বিক্রি করছিল, কেউ আবার পিঠাপুলি এবং অন্যান্য পিঠা বিক্রি করছিল। তবে, মেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বিক্রিত পণ্য ছিল হস্তশিল্প এবং সঙ্গীতের যন্ত্র।
এছাড়া মেলা ছিল একটি স্থানীয় শিল্পীদের জন্য নতুন সুযোগ। গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প, যেমন মাটির হাঁড়ি, পোড়ামাটির গয়না, মাটির ভাঁড়, সেগুলি বিক্রি করা হচ্ছিল। এগুলি মূলত হস্তশিল্পীদের জন্য একটি বড় প্ল্যাটফর্ম ছিল, যেখানে তারা তাদের শিল্প দেখাতে পারে এবং সেগুলির জন্য ভালো দাম পেতে পারে।
মেলার বিভিন্ন আকর্ষণ:
মেলা নানা রকমের আকর্ষণ নিয়ে আসে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য মেলা ছিল এক ধরনের স্বপ্নের জগৎ। এখানে নানা রকমের রাইড ছিল—কিছু ছিল হালকা উত্তেজনাপূর্ণ, আবার কিছু ছিল সজাগতা এবং সাহসিকতার পরীক্ষা। একজন ছোট বাচ্চা যখন প্রথমবার ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে, তার মুখে যে আনন্দের উজ্জ্বলতা থাকে, তা যেন সারা পৃথিবীকে ছাড়িয়ে যায়।
এছাড়া মেলায় রঙিন বাতির উজ্জ্বলতা, গান-বাজনা, খাবার আর নানা রকমের রোলার কোস্টার, ঝুলন্ত রাইড এবং আনন্দের অন্যান্য মাধ্যমরা মেলায় সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছিল। বিকেল বেলায়, মেলা রঙিন হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন পুরো মাঠ জুড়ে বড় বড় আলোর ঝলকানি চলে।
উপসংহার:
মেলা শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি একটি ঐতিহ্য, এটি আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেলা মানুষের মধ্যে এক ধরনের সঙ্গতি সৃষ্টি করে, ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ায়, এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জাগরিত করে। যে মেলা আমি দেখেছি, সেটি শুধু আনন্দের একটি উৎস ছিল না, বরং এক ধরনের জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতা। সেখানে মানুষের মুখে আনন্দের হাসি, বন্ধন ও সম্পর্কের গভীরতা এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার পরিচয় মেলে।
এমন মেলা সমাজে এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করতে পারে, যা শুধু বাণিজ্যিক লাভের জন্য নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত এই ধরনের মেলাগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং এটিকে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া, যাতে তারা এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তাদের জীবনে ধারণ করতে পারে।
আরো পড়ুন:
ডাবের জলে উপকারিতা click Here
দুধের উপকারিতা click here
ওজোন গ্যাস click here
রক্ত সম্পর্কে আলোচনা click here
অস্থি বা হাড়ের কার্যাবলী Click here
থাইরয়েড গ্রন্থির প্রশ্ন উত্তর Click here
প্রবন্ধ রচনা দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞান Click here
একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রবন্ধ রচনা click here
বাংলার উৎসব প্রবন্ধ রচনা Click here
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার প্রবন্ধ রচনা Click here
গাছ আমাদের বন্ধু প্রবন্ধ রচনা Click here
মেলা প্রবন্ধ রচনা Click here
ধ্বনি ও স্বরধ্বনির প্রশ্ন উত্তর Click here
0 Comments