ধ্বনি পরিবর্তনের Part-2
১) ধ্বনির রুপান্তর:
ধ্বনির রূপান্তর ধ্বনি পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একটি ধ্বনি ভিন্ন ধ্বনির সংস্পর্শে এলে, একটির প্রভাবে অন্যটি বদলে যেতে পারে। বিভিন্ন কারণে ধ্বনির এই বদল ঘটে। ধ্বনির রূপান্তর দু-প্রকার-
ক)স্বরধ্বনির রূপান্তর
খ) ব্যঞ্জনধ্বনির রূপান্তর
ক) স্বরধ্বনির রুপান্তর:
শব্দের মধ্যে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন স্বরধ্বনি থাকলে একটির প্রভাবে আর একটি পালটে যেতে পারে। স্বরধ্বনি রূপান্তরের দুটি প্রক্রিয়া আমরা লক্ষ করি। একটি স্বরসংগতি অন্যটি অভিশ্রুতি।
স্বরসংগতি :
‘স্বরসংগতি’ শব্দটির অর্থ হল বিভিন্ন ধরনের স্বরের মধ্যে সংগতি বা সমতাবিধান। শব্দের মধ্যে একাধিক স্বরধ্বনি থাকলে একটির প্রভাবে অন্যটি বদলে যায় আবার কখনও পরস্পরের প্রভাবে উভয়েই পরিবর্তিত হয়ে ধ্বনিসাম্য লাভ করে, ধ্বনি পরিবর্তনের ভাষায় একেই স্বরসংগতি বলে। যেমন—বিলাতি > বিলিতি, দেশি > দিশি ইত্যাদি। স্বরধ্বনি পরিবর্তনের অভিমুখ অনুসারে স্বরসংগতি তিনপ্রকার—
ক)প্রগত
খ)পরাগত
গ) অন্যোন্য।
ক)প্রগত স্বরসংগতি:
পূর্ববর্তী স্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বরধ্বনি বদলে গেলে তাকে প্রগত স্বরসংগতি বলে।
যেমন–মিথ্যা > মিথ্যে, আ > এ, ‘ই’-এর প্রভাবে অনুরূপে হিসাব > হিসেব, তিনটা > তিনটে ইত্যাদি।
খ)পরাগত স্বরসংগতি:
পরবর্তী স্বরধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি বদলে গেলে তাকে পরাগত স্বরসংগতি বলে। যেমন—দেশি > দিশি, এ > ই, ই-এর প্রভাবে পিছন > পেছন ইত্যাদি।
গ)অন্যোন্য স্বরসংগতি:
শব্দের মধ্যে অবস্থিত স্বরধ্বনিগুলি যখন পরস্পরের প্রভাবে উভয়ই পালটে যায় তখন তাকে অন্যোন্য স্বরসংগতি বলে। যেমন—শেফালি > শিউলি, নাটকিয়া > নাটুকে ইত্যাদি।
অভিশ্রুতি:
অপিনিহিতির ফলে পূর্বে আগত ই-কার কিংবা উ-কার যখন সন্নিহিত স্বরধ্বনিকে প্রভাবিত করে ধ্বনি পরিবর্তন সাধন করে তখন তাকে অভিশ্রুতি বলে। এক্ষেত্রে স্বরসংগতির প্রভাবটিও লক্ষণীয়। যেমন- করিয়া > কইরা/কইর্যা (অপিনিহিতি) > করে (অভিশ্রুতি), কালি > কাইল > কাল, রাতি > রাইত > রাত, ধরিয়া > ধইরা > ধরে, বলিয়া > বইল্যা > বলে, আসিয়া > আইস্যা > এসে, বানিয়া > বাইন্যা > বেনে ইত্যাদি।
*ব্যঞ্জনধ্বনির রূপান্তর:
ব্যঞ্জনধ্বনির সংখ্যা স্বরধ্বনির চেয়ে বেশি। এ কারণে ব্যঞ্জনধ্বনির রূপান্তরে অনেক বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়।
সমীভবন:
ভিন্ন ভিন্ন বর্গের ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি থাকলে উচ্চারণের সুবিধার জন্য দুটিকে একই বর্গের ধ্বনিতে রূপান্তরিত করা হয় বা একে অপরের প্রভাবে পড়ে সমভাবে পরিবর্তিত হয় অর্থাৎ সংযুক্ত ব্যঞ্জনকে দ্বিত ব্যঞ্জনে রূপান্তরিত করার রীতিকেই সমীভবন বলে। যেমন—পদ্ম > পদ্দ, গল্প > গল্প। ধ্বনি পরিবর্তনের অভিমুখ অনুসারে সমীভবন তিনপ্রকার-
ক) প্রগত
খ) পরাগত
গ) অন্যোন্য
ক) প্রগত সমীভবন:
পূর্ববর্তী ধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী ধ্বনিটি বদলে গেলে তাকে প্রগত সমীভবন বলা হয়। যেমন- পক্ব > পক্ক ( > কৃক), চক্র > চক্ক (ক্রর > কৃক)।
খ) পরাগত সমীভবন:
পূর্বের ধ্বনিটি পরবর্তী ধ্বনির প্রভাবে পালটে গেলে তাকে পরাগত সমীভবন বলে।যেমন-গল্প > গল্প (ল্প > প্প), পোদার > পোদ্দার (ত্দ > দ্দ), কর্পূর > কপ্পুর, (রূপ > প্প) ইত্যাদি।
গ) অন্যোন্য সমীভবন:
পরস্পর দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি একে অপরকে বদলে দিলে তাকে অন্যোন্য সমীভবন বলে।যেমন-মহোৎসব > মোচ্ছব (স > চছ), উৎ + শ্বাস > উচ্ছ্বাস।
* বিষমীভবন: সমীভবনের বিপরীত প্রক্রিয়া বিষমীভবন।
কোনো শব্দের মধ্যে একইরকম ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে উচ্চারণের সময় সেই ব্যঞ্জনধ্বনি যদি পালটে যায় তবে ধ্বনি পরিবর্তনের সেই রীতিকে বিষমীভবন বলা হয়। যেমন—লাল > নাল (লল > নল), শরীর > শরীল (রর > রল) ইত্যাদি।
*ঘোষীভবন:
অঘোষ ধ্বনি ঘোষ ধ্বনিতে পরিণত হলে তাকে ঘোষীভবন বলে। যেমন— উপকার > উপগার (ক > গ), কাক > কাগ (ক > গ), কতদূর > কদ্দুর (ত > দ), ছোটদা > ছোড়দা (ট > ড়) ইত্যাদি।
অঘোষীভবন:
ঘোষ ধ্বনি অঘোষ ধ্বনিতে পরিণত হলে তাকে অঘোষীভবন বলে। যেমন-ছাদ > ছাত (দ > ত), পাপড়ি > পাবড়ি (প > ব), বড়ঠাকুর > বঠাকুর (ড় > ট) ইত্যাদি।
মহাপ্রাণীভবন:
অল্পপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনি মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনিতে রূপান্তরিত হলে তাকে মহাপ্রাণীভবন বা পীনায়ন বলে। যেমন— বিবাহ > বিভাহ (ব > ভ), লিচু > লিছু (চ > ছ) ইত্যাদি। কোনো কোনো ভাষাতাত্ত্বিক মহাপ্রাণীভবনকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন। যখন মহাপ্রাণ ধ্বনির প্রভাবে অল্পপ্রাণ ধ্বনি, মহাপ্রাণ ধ্বনিতে বদলে যায় সেই প্রক্রিয়াটিকে মহাপ্রাণীভবন বলে। কিন্তু মহাপ্রাণ ধ্বনির প্রভাব ছাড়া যখন অল্পপ্রাণ ধ্বনি মহাপ্রাণ ধ্বনিতে বদলে যায়, সেই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয়েছে মহাপ্রাণীভবন। যেমন—জান > ঝান ,বিবাহ > বিভাহ (মহাপ্রাণীভবন)।
,
*অল্পপ্রাণীভবন : মহাপ্রাণীভবনের বিপরীত প্রক্রিয়া অল্পপ্রাণীভবন।
যে-প্রক্রিয়ায় মহাপ্রাণধ্বনি অল্পপ্রাণধ্বনিতে পরিণত হয় সেই প্রক্রিয়াকে অল্পপ্রাণীভবন বা ক্ষীণায়ন বলে। যেমন- দুধ > দুদ (ধ > দ), শৃঙ্খল > শেকল (খ > ক) ইত্যাদি।
* মূর্ধন্যীভবন:
মূর্ধন্য ধ্বনির প্রভাবে দন্ত্যধ্বনি মূর্ধন্য ধ্বনিতে রূপান্তরিত হলে তাকে মূর্ধন্যীভবন বলে। যেমন— মৃত্তিকা > মাটি (ত > ম), বৃদ্ধ > বুড়া (দ > ড়) ইত্যাদি। মূর্ধন্য ধ্বনির প্রভাব ছাড়া দন্ত্যধ্বনি মূর্ধন্য ধ্বনিতে রূপান্তরিত হলে তাকে স্বতোমূর্ধন্যীভবন বলে। যেমন—বালতি > বালটি (ত > ট), পতঙ্গ > ফড়িং (ত > ড়) ইত্যাদি।
উষ্মীভবন:
স্পর্শ ধ্বনি উষ্ম ধ্বনিতে পরিণত হলে তাকে উষ্মীভবন বলে। যেমন—মহাসুখ > মহাসুহ (খ > হ), কালীপূজা খালীফুজা (ক > খ, প > ফ) এই ধরনের ধ্বনি পরিবর্তন রাঢ়িতে তেমন লক্ষ করা যায় না।
নাসিক্যীভবন:
নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হওয়ার ফলে এ শব্দমধ্যস্থ স্বরধ্বনি যদি আনুনাসিক হয়ে যায় তাহলে তাকে নাসিক্যীভবন বলে। যেমন–চন্দ্ৰ > চাঁদ, হংস > হাঁস, দন্ত >
দাঁত, চম্পা > চাঁপা, সন্ধ্যা > সাঁঝ।
* স্বতোনাসিক্যীভবন:
নাসিক্য ধ্বনির প্রভাব ছাড়া স্বরধ্বনি আনুনাসিক হয়ে গেলে তাকে স্বতোনাসিক্যভবন বলে। যেমন- ঝাটা > ঝাঁটা, পেচক > প্যাঁচা, হাসপাতাল > হাঁসপাতাল ইত্যাদি।
সকারীভবন : উম্মীভবনের জন্য খৃষ্ট ধ্বনি স, শ, জ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হলে তাকে সকারীভবন বলে। যেমন—খেয়েছে > খাইসে, গাছ > গাস, বলেছে > বলসে ইত্যাদি। পূর্ববঙ্গের বঙ্গালি উপভাষায় এই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
ও রকারীভবন : ‘স’ ধ্বনি প্রথমে 'জ' এবং পরে 'র’ ধ্বনিতে পরিণত হলে তাকে রকারীভবন বলে। যেমন- পঞ্চদশ > পনেরো, দ্বাদশ > বারো।
ঘ) ধ্বনির স্থান বদল
দ্রুত উচ্চারণের ফলে কিংবা অসতর্কতার জন্য শব্দমধ্যস্থ ধ্বনিগুলি নিজেদের মধ্যে জায়গা বদল করে নেয়। ধ্বনি পরিবর্তনের এ ধরনের নিয়মকে বলে ধ্বনির স্থানান্তর। এই স্থানান্তর স্বরধ্বনি এবং ব্যঞ্জনধ্বনি উভয় ক্ষেত্রে ঘটে। স্বরধ্বনির স্থানান্তরজনিত একটি ধ্বনি পরিবর্তন হল—
* অপিনিহিতি- ব্যঞ্জনধ্বনির স্থানান্তরজনিত অন্য ধ্বনি পরিবর্তন হল ধ্বনিবিপর্যয়।
অপিনিহিত:
‘অপি’ শব্দটির অর্থ পূর্বে এবং ‘নিহিতি’ বা নিহিতের অর্থ সন্নিবেশ। সুতরাং শব্দের মধ্যস্থিত ‘ই -কার' কিংবা ‘উ-কার’ স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে যদি পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের পূর্বে এসে উচ্চারিত হয়, তাহলে সেই রীতিকে বলে অপিনিহিতি। পূর্ববঙ্গ বা অধুনা বাংলাদেশের কথ্য বাংলায় অপিনিহিতির বহুল প্রচলন দেখা যায়। যেমন—করিয়া > কইরা, সাধু > সাউধ, বলিয়া > বইলা, দেখিয়া > দেইখা ইত্যাদি।
ধ্বনিবিপর্যয়:
উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দমধ্যস্থ দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি যদি নিজেদের মধ্যে স্থান বদল করে উচ্চারিত হয় তবে ধ্বনি পরিবর্তনের সেই নিয়মকে বলে ধ্বনিবিপর্যয়।যেমন-বাতাসা > বাসাতা, পিশাচ > পিচাশ, রিক্শা > রিশ্কা, হ্রদ > হ্রদ > দহ, জানলা > জালনা প্রভৃতি।
CONTENTS:
আরো পড়ুন:
কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি কবিতার প্রশ্ন উত্তর Click Here ধীবর-বৃত্তান্ত নাট্যাংশের প্রশ্ন
উত্তর Click Here ইলিয়াস গল্পের প্রশ্ন উত্তর Click Here দাম গল্পের প্রশ্ন উত্তর Click
Here নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের প্রশ্ন উত্তর Click Here হিমালয় দর্শন গল্পের প্রশ্ন
উত্তর Click Here ভাঙার গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর click Here আবহমান কবিতার প্রশ্ন
উত্তর Click Here আমরা কবিতা প্রশ্ন উত্তর click Here খেয়া কবিতার প্রশ্ন উত্তর click
Here নিরুদ্দেশ গল্পের প্রশ্ন উত্তর click Here চন্দ্রনাথ গল্পের প্রশ্ন উত্তর part-1 click
Here চন্দ্রনাথ গল্পের প্রশ্ন উত্তর part-2 click Here
ব্যোমযাত্রীর ডায়েরির প্রশ্ন উত্তর Click Here
কর্ভাস গল্পের প্রশ্ন উত্তর Click Here
Teles of Bhola grandpa Lesson1 Unit 1 Click Here
Teles of Bhola grandpa Unit 2 Click Here
All about a Dog Lesson 2-Unit -1 -Click Here
All about a Dog Lesson 2 Unit 2 Click Here
Autumn poem Lesson 3 Part 1 Click Here
A Day in the zoo Lesson 4 Part 1 Click Here
A Day in the zoo Lesson 4 part 2 Click Here
All Summer in a Day Lesson 5 part 1 Click Here
The price of bananas part 1 click Here
The price of bananas part 2 click Here
Hunting snake poem question answer click Here
Cucumber is beneficial for the body click Here
ডাবের জলে উপকারিতা click Here
দুধের উপকারিতা click here
ওজোন গ্যাস click here
রক্ত সম্পর্কে আলোচনা click here
অস্থি বা হাড়ের কার্যাবলী Click here
থাইরয়েড গ্রন্থির প্রশ্ন উত্তর Click here
প্রবন্ধ রচনা দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞান Click here
একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রবন্ধ রচনা click here
বাংলার উৎসব প্রবন্ধ রচনা Click here
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার প্রবন্ধ রচনা Click here
0 Comments