ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ:
ভাষার ক্ষুদ্রতম অর্থপূর্ণ একক হল ধ্বনি।তাই ধ্বনি পালটে গেলে ভাষার মধ্যে পার্থক্য ঘটে।ভাষা বদলে যাওয়া অর্থাৎ ক্ষুদ্রতম এককগুলি বদলে যাওয়া। এখন প্রশ্ন হল, ধ্বনি বদলে যায় কেন?ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ কী? ধ্বনি একাধিক কারণে বদলে যায়। ধ্বনি পরিবর্তনের কারণগুলি হল-
ক)বাগযন্ত্রের ত্রুটি:
ধ্বনি বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত হয়। বাগ যন্ত্রের ত্রুটি বা দুর্বলতা থাকলে ধ্বনি স্পষ্টরূপে উচ্চারিত হতে পারে না বা উচ্চারণ করা যায় না। এজন্য ধ্বনির মূল রূপটি বদলে যায়।
খ)দ্রুত উচ্চারণ:
দ্রুত উচ্চারণ করতে গেলে ধ্বনি পালটে যেতে পারে। যেমন-কোথা থেকে এলি' এটি দ্রুত উচ্চারণ করতে গিয়ে হয়ে যেতে পারে-কোত্থেকে এলি’।'গভর্নমেন্ট' পালটে হয়ে যেতে পারে ‘গম্মেন্ট’।আবার পিশাচ' হয়ে যায় 'পিচাশ' বা রিক্শা > রিশ্কা।
গ) উচ্চারণ সহজ করার প্রবণতা:
সহজ করে উচ্চারণ করতে গেলে ধ্বনি পালটে যেতে পারে।যেমন-'এমন কর্ম আর করব না'-এটি সহজে উচ্চারণ করতে গিয়ে হতে পারে ‘এমন কৰ্ম্ম আর করবো না'।আবার জন্মেও দেখিনি > জম্মেও দেখিনি।
ঘ)আবেগ:
আবেগের বহিঃপ্রকাশে কখনো-কখনো
ধ্বনিকে পালটে দেয়।যেমন-মামা > মামু, কাকা > কাকু, জ্যাঠা > জেঠু। ইত্যাদির কারণে শব্দের ধ্বনি পালটে যেতে পারে।
ঙ)শ্বাসাঘাত:
শ্বাসাঘাত হল শব্দে কোনো ধ্বনির উপর উচ্চারিত শ্বাসের আঘাত বা জোর পড়া। শব্দের মধ্যে কোনো ধ্বনির ওপর শ্বাসাঘাত পড়লে মূল শব্দ থেকে ধ্বনি লুপ্ত হতে পারে কিংবা কোনো ধ্বনির আগমন ঘটতে পারে। যেমন— গামোছা > গামছা – আদি স্বরে জোর পড়ায় '' লুপ্ত হয়েছে। আবার সকল > সঙ্কল, 'ক' ধ্বনিটি দ্বিত্ব হয়েছে শ্বাসাঘাতের ফলে।
ঙ) ছন্দ:
কবি-সাহিত্যিকরা কাব্যসৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য বা ধ্বনিসুষমা বজায় রাখার জন্য শব্দে ধ্বনির বদল ঘটাতে পারেন। যেমন – একটি রতন মোরে দিয়াছিল বিধি। রত্ন > রতন।
চ)আঞ্চলিক:
ভাষার আঞ্চলিক প্রভাব বা ডায়ালেক্টের কারণেও ধ্বনির রূপান্তর ঘটে। যেমন— গাড়ি > গারি। কোথাও কোথাও ভূ, র্ রূপে উচ্চারিত হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে শ' ধ্বনি ‘ছ' রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন – শশিবাবু' > ছছিবাবু'।
* ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়ম:
শব্দের মধ্যে ধ্বনির এই পরিবর্তন সাধারণত চার রকম ভাবে ঘটে।ধ্বনি কীভাবে বদলে যায় তার বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ রেখে ধ্বনি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে কতকগুলি নিয়মের মধ্যে রেখে ব্যাখ্যা করা হয-
ক) ধ্বনির আগমন
খ) ধ্বনির লোপ
গ)ধ্বনির রূপান্তর
ঘ)ধ্বনির স্থান বদল
ধ্বনির চারপ্রকার পরিবর্তন উভয় ধ্বনিতেই লক্ষ করা যায়-
স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে- স্বরের আগমন বা স্বরাগম, ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রে ব্যঞ্জনের আগমন বা ব্যঞ্জনাগম। অনুরুপে স্বরলোপ, ব্যঞ্জনলোপ,স্বরের রূপান্তর, ব্যঞ্জনের রূপান্তর,স্বরের স্থানান্তর, ব্যঞ্জন এর স্থানান্তর,-এগুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-
১)ধ্বন্যাগম:
ধ্বন্যাম হল শব্দে অতিরিক্ত ধ্বনির আগমন। উচ্চারণের সুবিধার জন্য কোনো শব্দে অতিরিক্ত ধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে ধ্বন্যাগম বলে।ধ্বন্যাগম দু প্রকার-
ক)স্বরাগম
খ) ব্যঞ্জনাগম
ক)স্বরাগম: উচ্চারণের সুবিধার্থে শব্দের মধ্যে অতিরিক্ত স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে স্বরাগম বলে। যেমন- গ্রাম > গেরাম, স্কুল > ইস্কুল, স্টোভ > এস্টোভ ইত্যাদি।
স্বরাগম তিনপ্রকার-
i) আদি স্বরাগম:
শব্দের প্রথমে বা আদিতে স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে আদি স্বরাগম বলে। যেমন-স্কুল > ইস্কুল, স্টোভ > এস্টোভ ইত্যাদি।
ii) মধ্য স্বরাগম:
শব্দের মাঝে স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে মধ্য স্বরাগম বা স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ বলে। যেমন-রত্ন > রতন, গ্রাম > গেরাম ইত্যাদি।
iii) অন্ত্য স্বরাগম:
শব্দের শেষে অতিরিক্ত স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে অন্ত্য স্বরাগম বলে। যেমন-ই > ইঞ্চি, বেশ > বেশি ইত্যাদি।
খ)ব্যঞ্জনাগম:
উচ্চারণের সুবিধার্থে শব্দের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমনকে ব্যঞ্জনাগম বলে। যেমন--- উপকথা > রূপকথা, নানা > নানান, সীমা > সীমানা ইত্যাদি শব্দের মধ্যে ব্যঞ্জনধ্বনির আগমনের অবস্থান অনুসারে ব্যঞ্জনাগম তিনপ্রকার-
i)আদি ব্যঞ্জনাগম
ii)মধ্য ব্যঞ্জনাগম
iii)অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম
i) আদি ব্যঞ্জনাগম:
শব্দের আদি অর্থাৎ প্রথমে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে আদি ব্যঞ্জনাগম বলে। যেমন-উপকথা > রূপকথা, ওমলেট > মামলেট ইত্যাদি।
ii)মধ্য ব্যঞ্জনাগম:
শব্দের মাঝে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে মধ্য বানাগম বলে। যেমন-অম্ল অম্বল, বানর > বান্দর ইত্যাদি।
iii)অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম:
শব্দের অন্তে বা শেষে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম বলে। যেমন—নানা > নানান, বহু > বহুল, খোকা > খোকন, সীমা > সীমানা ইত্যাদি।
৩)শ্রুতধ্বনি:
পাশাপাশি বা সন্নিহিত দুটি ধ্বনির উচ্চারণকালে উচ্চারণের অসতর্কতা বা শ্রুতিমাধুর্যের জন্য ওই দুটি ধ্বনির মাঝখানে তৃতীয় একটি ধ্বনির আগমন ঘটলে ধ্বনি পরিবর্তনের সেই নিয়মকে শ্রুতধ্বনি বলে।
যেমন–শৃগাল > শিআল > শিয়াল। মাআ > মায়া ইত্যাদি।
*‘য়’ শ্রুতি » দুটি স্বরধ্বনির মাঝে ‘য়’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ‘য়’ শ্রুতি। যেমন—মাআ > মায়া, সাঅর > সায়র।
*'ব' শ্রুতি দুটি স্বরধ্বনির মাঝে ‘ব’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ব’ শ্রুতি। যেমন—নাএ > নাবে, যাআ > যাবা।
*'দ' শ্রুতি দুটি ধ্বনির মাঝে ‘দ’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি 'দ' শ্রুতি। যেমন—বানর > বান্দর/বাদর, জেনারেল > জাঁদরেল।
* 'র' শ্রুতি দুটি ধ্বনির মাঝে 'র' ধ্বনি শোনা গেলে সেটি 'র' শ্রুতি। যেমন-পুষ্ট > পুরুষ্ট।
* হ’ শ্রুতি-দুটি স্বরধ্বনির মাঝে ‘হ’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ‘হ’ শ্রুতি।যেমন-বেআরা > বেহারা, রাউল > রাহুল।
৪) ধ্বনিলোপ:
শব্দের মধ্য থেকে কোনো ধ্বনি লুপ্ত হয়ে গেলে তাকে ধ্বনিলোপ বলে। ধ্বনিলোপ একাধিক কারণে ঘটতে পারে।উচ্চারণের ত্রুটি,শ্বাসাঘাত, দ্রুত উচ্চারণ, অসাবধানতা,অনুকরণ,বাগযন্ত্রের ত্রুটি প্রভৃতি।
ধ্বনিলোপ দু প্রকার-
ক)স্বরধ্বনিলোপ
খ)ব্যঞ্জনধ্বনিলোপ।
ক)স্বরধ্বনিলোপ:
উচ্চারণের কিংবা বাগযন্ত্রের ত্রুটি,শ্বাসাঘাত, অসাবধানতা বা দ্রুত উচ্চারণের কারণে কোনো শব্দ থেকে স্বরধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে স্বরধ্বনিলোপ বলে। অবস্থানভেদে স্বরধ্বনিলোপ তিনপ্রকার-
i)আদি স্বরলোপ
ii)মধ্য স্বরলোপ
iii)অন্ত্য স্বরলোপ
i)আদি স্বরলোপ:
শব্দের আদি বা প্রথম থেকে কোনো স্বরধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে আদি স্বরলোপ বলে।
যেমন-আছিল > ছিল. অলাবু > লাউ ইত্যাদি।
ii) মধ্য স্বরলোপ:
শব্দের মাঝখান থেকে কোনো স্বরধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে মধ্য স্বরলোপ বলে।
যেমন-কলিকাতা > কলকাতা, নাতিজামাই > নাজামাই, গামোছা > গামছা ইত্যাদি।
iii) অন্ত্য স্বরলোপ: শব্দের অন্ত্য স্বর লুপ্ত হলে অন্ত্য স্বরলোপ বলে। যেমন-রাশি > রাশ, অগ্র > আগ্ ইত্যাদি।
৫)ব্যঞ্জনধ্বনিলোপ:
একই প্রক্রিয়ায় শব্দ থেকে ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে ব্যঞ্জনধ্বনিলোপ বলে। যেমন- পাটকাঠি > পাকাঠি, গ্রাম > গাঁ ইত্যাদি।
অবস্থানভেদে তিনপ্রকার এবং সমাক্ষরলোপ।অবস্থানভেদে-
ক) আদি ব্যঞ্জনলোপ
খ) মধ্য ব্যঞ্জনলোপ
গ)অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ
ক) আদি ব্যঞ্জনলোপ:
শব্দের আদি ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে আদি ব্যঞ্জনলোপ বলে। যেমন-স্থান > থান, স্থিতু> থিতু ইত্যাদি।
খ) মধ্য ব্যঞ্জনলোপ:
শব্দের মধ্য থেকে কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে মধ্য ব্যঞ্জনলোপ বলে। যেমন- ফাল্গুন > ফাগুন, ফলাহার > ফলার ইত্যাদি।
গ)অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ:
কোনো শব্দের অন্ত্য বা শেষ থেকে কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ বলে।
যেমন- সখী > সই, নাহি > নাই, গাত্র > গা।
*সমাক্ষরলোপ:
কোনো শব্দের মধ্য থেকে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি সমাক্ষর বা সমধ্বনির একটি লুপ্ত হলে তাকে সমাক্ষরলোপ বলে। যেমন-বড়দাদা > বড়দা, ছোটদিদি > ছোটদি, পটললতা > পলতা ইত্যাদি।
CONTENTS:
আরো পড়ুন:
কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি কবিতার প্রশ্ন উত্তর Click Here
ধীবর-বৃত্তান্ত নাট্যাংশের প্রশ্ন উত্তর Click Here
ইলিয়াস গল্পের প্রশ্ন উত্তর Click Here দাম গল্পের প্রশ্ন উত্তর Click Here
নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের প্রশ্ন উত্তর Click Here
হিমালয় দর্শন গল্পের প্রশ্ন উত্তর Click Here
ভাঙার গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর click Here
আবহমান কবিতার প্রশ্ন উত্তর Click Here
আমরা কবিতা প্রশ্ন উত্তর click Here
খেয়া কবিতার প্রশ্ন উত্তর click Here
নিরুদ্দেশ গল্পের প্রশ্ন উত্তর click Here
চন্দ্রনাথ গল্পের প্রশ্ন উত্তর part-1 clickHere
চন্দ্রনাথ গল্পের প্রশ্ন উত্তর part-2 click Here
ব্যোমযাত্রীর ডায়েরির প্রশ্ন উত্তর Click Here
কর্ভাস গল্পের প্রশ্ন উত্তর Click Here
Teles of Bhola grandpa Lesson1 Unit1 Click Here
Teles of Bhola grandpa Unit 2 Click Here
All about a Dog Lesson 2-Unit -1 -Click Here
All about a Dog Lesson 2 Unit 2 Click Here
Autumn poem Lesson 3 Part 1 Click Here
A Day in the zoo Lesson 4 Part 1 Click Here
A Day in the zoo Lesson 4 part 2 Click Here
All Summer in a Day Lesson 5 part 1 Click Here
The price of bananas part 1 click Here
The price of bananas part 2 click Here
Hunting snake poem question answer click Here
Cucumber is beneficial for the body click Here
ডাবের জলে উপকারিতা click Here
দুধের উপকারিতা click here
ওজোন গ্যাস click here
রক্ত সম্পর্কে আলোচনা click here
অস্থি বা হাড়ের কার্যাবলী Click here
থাইরয়েড গ্রন্থির প্রশ্ন উত্তর Click here
প্রবন্ধ রচনা দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞান Click here
একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রবন্ধ রচনা click here
বাংলার উৎসব প্রবন্ধ রচনা Click here
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার প্রবন্ধ রচনা Click here
-
0 Comments