সমাস কথাটির অর্থ হল- সংক্ষেপ করা।তাই নতুন নতুন শব্দ গঠন প্রক্রিয়ায় প্রত্যয়ের পরেই সমাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং শব্দ গঠনের এটি একটি অন্যতম পদ্ধতি।
সন্ধির ক্ষেত্রেও দুই বা ততোধিক শব্দ যুক্ত হয়। তবে সন্ধিতে শব্দ জোড়া হয় না। সেক্ষেত্রে একটি শব্দের শেষ ধ্বনির সঙ্গে অন্য একটি শব্দের প্রথম ধ্বনিকে জোড়া হয়। সন্ধিতে কোনো নতুন শব্দ তৈরি হয় না। কিন্তু সমাসে নতুন শব্দ তৈরি হয়।
সমাস কাকে বলে?
অর্থের দিক থেকে সম্বন্ধযুক্ত দুই বা তার বেশি পদ পরস্পর মিলিত হয়ে একপদে পরিণত হলে,তাকে সমাস বলে।যেমন-সূর্যের উদয়-সুর্যোদয়।
এক্ষেত্রে সূর্যের,ও উদয়,-পদ দুটি পরস্পর সম্বন্ধ ও পাশাপাশি অবস্থিত।এই পদ দুটির মিলনে 'সূর্যোদয়' সমাসবদ্ধ পদ তৈরি হয়েছে।
আবার নিম্নে উদাহরণ হল-১)আজ বীণা পাণিতে যার, তার পুজো হবে। ২)আজ বীণাপাণির পুজো হবে।
উপরে দুটি বাক্যের মূল বক্তব্য বা অর্থ এক।পার্থক্য শুধু বাক্য-মধ্যস্থ পদের সংখ্যায়।প্রথম উদাহরণে পদের সংখ্যা সাত এবং দ্বিতীয় উদাহরণে পদের সংখ্যা চার।
তা ছাড়া আমরা যখন কথা বলি তখন অবশ্যই দ্বিতীয় বাক্যটি ব্যবহার করি, প্রথমটি নয়।কারণ এতে,পদের সংখ্যা কমলে মনের ভাব প্রকাশে সময় কম লাগে।নিজের বক্তব্য সুন্দরভাবে উপস্থাপিত যেমন করা যায়, তেমনি শ্রোতার শুনতে ও বুঝতে অসুবিধা হয় না।
লক্ষণীয় ‘বীণা পাণিতে যাহার' তাই তিনটি পদ একটি পদে (বীণাপাণি) পরিণত হয়েছে।এইভাবে দুই বা ততোধিক পদের একপদে 'সংক্ষেপণ' বাপরিণত হওয়াকে সমাস বলে।
‘বীণা' (বাদ্যযন্ত্র বিশেষ) ও পাণি (হাত)- দুটি ভিন্ন অর্থযুক্ত পদ হলেও উভয়ের মধ্যে অর্থের সম্পর্ক রয়েছে; না হলে উভয়ের মিলন (বীণাপাণি) হত না।'সমাস' বা ‘সংক্ষেপণ' হওয়ার পক্ষে যা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
সমাসের ক্ষেত্রে একাধিক পদের মিলন ঘটানো হচ্ছে, এও যেমন সত্য,তেমন আবার দুই বা ততোধিক অর্থ সম্বন্ধযুক্ত পদের 'সংক্ষেপ' করা হচ্ছে, এও তেমন সত্য।
সমাস সংক্রান্ত পরিভাষা:
সমাস শিখতে হলে কয়েকটি সমাসের পরিভাষা জেনে নিতে হবে।নীচে এই পরিভাষাগুলো দেওয়া হল-
১)সমস্যমান পদ:
যে পদগুলির সমাস হয় তাদের প্রত্যেকটিকে সমস্যমান পদ বলে।যেমন-দলের পতি-দলপতি।এখানে ‘দলের’এবং'পতি’-এই পদ দুটি হল সমস্যমান পদ।
২)সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদ:
দুই বা ততোধিক সমস্যমান পদ মিলিত হয়ে যে পদ গঠিত হয়,তাকেই সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদ বলে।
যেমন- দলের পতি= দলপতি।এখানে ‘দলের’ ও ‘পতি'-এই সমস্যমান পদ দুটি মিলিত হয়ে ‘দলপতি' পদটি গঠিত হয়েছে। সুতরাং ‘দলপতি' হল সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদ। সমস্ত পদ বা সমাসবদ্ধ পদের অপর নামই হল সমাস।
৩)ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য:
সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদটির ব্যাখ্যা করার বা অর্থ বিশ্লেষণের জন্য যে বাক্যাংশের প্রয়োগ করা হয় তাকে ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে। যেমন, অজ্ঞাত- নয় (অ) জ্ঞাত। ‘অজ্ঞাত’পদটির অর্থ বিশ্লেষণ করলে ‘নয় (অ) জ্ঞাত'-এই বাক্যাংশটি পাওয়া যায়, তাই এটিই হল ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য।
৪)পূর্বপদ ও উত্তরপদ বা পরপদ:
ব্যাসবাক্যের প্রথম পদটিকে বলে পূর্বপদ এবং পরবর্তী পদকে বলা হয় উত্তরপদ বা পরপদ। যেমন, নীল যে আকাশ- নীলাকাশ। এখানে ‘নীল’ পূর্বপদ এবং ‘আকাশ’হল উত্তরপদ বা পরপদ।
সমাসের শ্রেণিবিভাগ:
সমাসকে নয়টি ভাগে ভাগ করা যায়-
১) দ্বন্দ্ব সমাস
২)তৎপুরুষ সমাস
৩)কর্মধারয় সমাস
৪) বহুব্রীহি সমাস
৫)দ্বিগু সমাস
৬) অব্যয়ীভাব সমাস
৭) নিত্য সমাস
৮) অলোপ সমাস
৯)বাক্যাশ্রয়ী সমাস
১) দ্বন্দ্ব সমাস:
যে সমাসে পূর্বপদ ও পরপদ উভয়ের অর্থই প্রাধান্য পায়, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। ‘দ্বন্দ্ব' শব্দটির অর্থ হল- মিলন বা যুক্ত।যেমন-পিতা ও মাতা=পিতামাতা, হাট ও বাজার= হাটবাজার দ্বন্দ্ব সমাসের কয়েকটি ভাগ লক্ষ করো।
ক) দুটি বিশেষ্য পদের দ্বন্দ্ব সমাস- ভাই ও বোন=ভাইবোন, দেব ও দেবী= দেবদেবী, সুখ ও দুঃখ= সুখদুঃখ
খ) দুটি সর্বনাম পদের দ্বন্দ্ব সমাস- তুমি ও আমি= তুমিআমি,এটা ও সেটা= এটাসেটা
গ) দুটি বিশেষণ পদের দ্বন্দ্ব সমাস- ভালো ও মন্দ= ভালোমন্দ, নরম ও গরম=নরমগরম,ধনী ও দরিদ্র= ধনীদরিদ্র
ঘ) দুটি ক্রিয়াপদের দ্বন্দ্ব সমাস-জেনে ও শুনে=জেনেশুনে, হেঁটে ও চলে=হেঁটেচলে
ঙ) সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস: দুটি একই অর্থযুক্ত বা প্রায় একই অর্থযুক্ত পদের মিলন হলে তাকে সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন-বন ও জঙ্গল=বনজঙ্গল, চালাক ও চতুর= চালাকচতুর, মাথা ও মুণ্ড= মাথামুণ্ড
চ) বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব সমাস: দুটি বিপরীত অর্থের শব্দের মধ্যে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে।যেমন- আকাশ ও পাতাল=আকাশপাতাল,জন্ম ও মৃত্যু= জন্মমৃত্যু কেনা ও বেচা=কেনাবেচা, ন্যায় ও অন্যায়= ন্যায়অন্যায়, আলো ও অন্ধকার= আলো-অন্ধকার।
ছ) একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস: দ্বন্দ্ব সমাসে সমাসবদ্ধ পদটি বহুবচন হলে তাকে একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস বলে।যেমন আমি তুমি ও সে- আমরা,তুমি ও সে-তোমরা
জ) বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস: যে দ্বন্দ্ব সমাসে অনেকগুলি পদ সমাসবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে থাকে,তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে।যেমন-ব্রক্ষ্মা ও বিষ্ণু ও মহেশ্বর= ব্রহ্মাবিষ্ণুমহেশ্বর।
২) তৎপুরুষ সমাস:
যে সমাসে পূর্বপদে বিভিন্ন কারকের বিভক্তি অথবা অনুসর্গ লোপ পায় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে।
তৎপুরুষ সমাসকে বেশ কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-
ক) কর্ম তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদে কর্মকারকের বিভক্তিচিহ্ন থাকে এবং সমাসবদ্ধ হলে তা লোপ পায়, তাকে কর্ম তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন- ছেলেকে ভুলানো= ছেলেভুলানো, লুচিকে ভাজা=লুচিভাজা, ভাতকে রাঁধা= ভাতরাঁধা, ঘাসকে কাটা= ঘাসকাটা।
খ)করণ তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদে করণকারকের বিভক্তি বা অনুসর্গ থাকে এবং সমাসবদ্ধ হলে তা লোপ পায় তাকে করণ তৎপুরুষ সমাস বলে।যেমন- পদ দ্বারা আঘাত= পদাঘাত, ঢেঁকি দ্বারা ছাঁটা=ঢেঁকিছাঁটা, লাঠি দ্বারা পেটা= লাঠিপেটা,লাঠি দ্বারা খেলা =লাঠিখেলা।
গ)নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদে নিমিত্তকারকের বিভক্তি বা অনুসর্গ থাকে এবং সমাসবদ্ধ হলে তা লোপ পায় তাকে নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন- রান্নার নিমিত্ত ঘর=রান্নাঘর,দেবতার নিমিত্ত পূজা= দেবপূজা,বিশ্রামের নিমিত্ত ঘর= বিশ্রামঘর,মুক্তির নিমিত্ত যুদ্ধ= মুক্তিযুদ্ধ।
ঘ) অপাদান তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদে অপাদানকারকের বিভক্তি বা অনুসর্গ থাকে এবং সমাসবদ্ধ হলে তা লোপ পায়, তাকে অপাদান তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন- মায়া থেকে মুক্ত= মায়ামুক্ত, বিলেত থেকে ফেরত=বিলেতফেরত,কর্ম থেকে বিরতি=কর্মবিরতি।
ঙ) সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদে সম্বন্ধপদের বিভক্তি থাকে এবং সমাসবদ্ধ হলে তা লোপ পায়, তাকে সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন-ধানের খেত= ধানখেত, মণ্ডলদের পাড়া= মণ্ডলপাড়া,রাজার পুত্র= রাজপুত্র, মানবের শিশু=মানবশিশু,রাজার বাড়ি= রাজবাড়ি।দেশের নেতা=দেশনেতা
* অনেক সময় সম্বন্ধ তৎপুরুষে পরপদ আগে বসে। যেমন, পথের রাজা=রাজপথ।
চ) অধিকরণ তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদে অধিকরণকারকের বিভক্তি থাকে এবং সমাসবদ্ধ হলে তা লোপ পায়, তাকে অধিকরণ তৎপুরুষ সমাস বলে।যেমন-গৃহে বাস=গৃহবাস, গোলায় ভরা= গোলাভরা,জলে মগ্ন= জলমগ্ন, গাছে পাকা=গাছপাকা।
ছ) একদেশী তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে একদেশবাচক পদের সঙ্গে সমাস হয়, তাকে একদেশী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন- নদীর মাঝ= মাঝনদী, অহ্নের মধ্য= মধ্যাহ্ন, রাত্রির মধ্য= মধ্যরাত্রি প্রভৃতি।
জ) না-তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদ না-বাচক শব্দ এবং পরপদ বিশেষ্য বা বিশেষণ হয় তাকে না-তৎপুরুষ সমাস বলে।না- তৎপুরুষে না-বাচক শব্দটি ‘নয়' অর্থে ব্যবহৃত হয়- যেমন- নয় বালক= নাবালক, নয় জানা= অজানা, নয় সম্ভব= অসম্ভব, নয় আবৃত= অনাবৃত, নয় অভ্যাস= অনভ্যাস।
ঝ) উপপদ তৎপুরুষ সমাস:
উপপদের সঙ্গে কৃৎপ্রত্যয়যুক্ত পদের সমাসকে উপপদ তৎপুরুষ সমাস বলে। কৃৎপ্রত্যয়যুক্ত পদকে বলে কৃদন্ত পদ। কৃদন্ত পদের আগে যে পদ থাকে, তাকে উপপদ বলে।
যেমন- সত্য বলে যে= সত্যবাদী,মধুপান করে যে= মধুপ, জাদু করে যে= জাদুকর,সর্ব হারিয়েছে যে= সর্বহারা, ইন্দ্রকে জয় করেছে যে=ইন্দ্রজিৎ।
৩) কর্মধারয় সমাস:
যে সমাসে পূর্বপদ সাধারণত পরপদের বিশেষণ হিসেবে থাকে এবং সমাসবদ্ধ পদে পরপদের অর্থই প্রাধান্য পায়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন-যিনি দেম তিনি ঋষি= দেবর্ষি।
*কর্মধারয় সমাসের শ্রেণীবিভাগ-
ক)সাধারণ কর্মধারয় সমাস
খ)উপমান কর্মধারয় সমাস
গ) মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
ঘ)উপমিত কর্মধারায় সমাস
ঙ)ৰূপককর্মধারয় সমাস
ক) সাধারণ কর্মধারয় সমাস:
দুটি বিশেষণ অথবা একটি বিশেষ্য,একটি বিশেষণ কিংবা দুটি বিশেষ্য পদের মধ্যে কর্মধারয় সমাসের সাধারণ নিয়মে যে সমাস হয়,তাকে সাধারণ কর্মধারয় সমাস বলে।যেমন-যেমন-যা সহজ তাই সরল-সহজসরল,কাঁচা অথচ মিঠে—কাঁচামিঠে, কঠোর অথচ কোমল—কঠোরকোমল,।
খ)উপমান কর্মধারয় সমাস:
উপমিত,উপমান এবং রূপক কর্মধারয় সমাস সম্পর্কে জানতে গেলে কয়েকটি বিষয় জানা দরকার-
১) উপমা:দুটি ভিন্ন জাতীয় বস্তুর মধ্যে তুলনাকে উপমা বলে।যেমন-চাদের মতো মুখ।
২) উপমেয়: যাকে তুলনা করা হয় তাকে বলে উপমেয়। যেমন-উপরের উদাহরণে 'মুখ' উপমেয়।
৩)উপমান:যার সঙ্গে তুলনা করা হয় তাকে বলে উপমান।যেমন- উপরের উদাহরণে 'চাঁদ' উপমান।
৪)সাধারণ ধর্ম:যে বৈশিষ্ট্য বা গুণের জন্য দুটি বস্তুর মধ্যে তুলনা করা হয়,তাকে বলে সাধারণ ধর্ম। চাঁদ ও মুখের মধ্যে তুলনায় "সৌন্দর্য' সাধারণ ধর্ম।
গ) উপমিত কর্মধারয় সমাস: যে কর্মধারয় সমাসে উপমেয় এবং উপমান থাকে কিন্তু সাধারণ ধর্মের উল্লেখ থাকে না,তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন-নর সিংহের ন্যায়-নরসিংহ, পোকা কাচের মতো-কাচপোকা,কথা অমৃতের মতো-কথামৃত,।
ঘ) উপমান কর্মধারয় সমাস:
যে কর্মধারয় সমাসে উপমান এবং সাধারণ ধর্ম থাকে কিন্তু উপমেয়র উল্লেখ থাকে না, তাকে বলে উপমান কর্মধারয় সমাস। যেমন-বরফের মতো
সাদা-বরফসাদা,বজ্রের মতো কঠিন-বজ্রকঠিন, কুসুমের মতো কোমল-কুসুমকোমল,
ঙ) রূপক কর্মধারয় সমাস:
যে কর্মধারয় সমাসে উপমেয় এবং উপমানের মধ্যে তুলনা না করে অভেদ কল্পনা করা হয়,তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে।যেমন-আশা রূপ লতা-আশালতা,সংসার রূপ সাগর—সংসারসাগর, মায়া রূপ ডোর-মায়াডোর,মন রূপ মাঝি-মনমাঝি,।
চ) মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস :
যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যে লোপ পায় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন- সিংহ চিহ্নিত আসন-সিংহাসন, ঘরে আশ্রিত জামাই- ঘরজামাই,বিদেশ বিষয়ক মন্ত্রী-বিদেশমন্ত্রী, পথে অনুষ্ঠিত সভা-পথসভা।
৪) বহুব্রীহি সমাস:
বহুব্রীহি সমাসকে বিশ্লেষণ করলে পূর্ব ও পরপদের ভেতর কারোর অর্থ না বুঝিয়ে তৃতীয় অর্থ প্রাধান্য পায়, তাকেই বলে বহুব্রীহি সমাস।
* বহু (অনেক) ব্রীহি (ধান্য) যাহার—বহুব্রীহি। এখানে 'বহু’কে বা ‘ব্রীহি'কে না বুঝিয়ে ‘জমিদার'কে বা ভূস্বামীকে বোঝাচ্ছে।
যেমন:বীণাপাণি = বীণা পাণিতে যার, এখানে 'সরস্বতী দেবী'কে বোঝানো হয়েছে।
* বহুব্রীহি সমাসের শ্রেণীবিভাগ-
ক) সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস:
যে বহুব্রীহি সমাসে উভয়পদের বিভক্তি সমান থাকে এবং পূর্বপদটি পরপদের বিশেষণ হলে,তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।যেমন- পীত অম্বর যার = পীতাম্বর (কৃষ্ণ), বিশাল অক্ষি যার = বিশালাক্ষ (পুং), বিশালাক্ষী (স্ত্রী)।
খ) ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস:
যে বহুব্রীহি সমাসে সমস্যমান পদগুলি পৃথক বিভক্তিযুক্ত হয় এবং উভয় পদেই বিশেষ্য পদ থাকে, তাকে ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।
যেমন-বজ্র পাণিতে যার = বজ্রপাণি (ইন্দ্র),পদ্ম নাভিতে যার = পদ্মনাভ (বিষ্ণু)।
গ) মধ্যপদলোপী বা উপমাবাচক বহুব্রীহি সমাস:
যে বহুব্রীহি সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদ লোপ পায়, তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে। এই জাতীয় বহুব্রীহি সমাসে একটি উপমান পদ থাকে বলে একে উপমাবাচক বহুব্রীহি সমাস বলা হয়। যেমন-চাঁদের ন্যায় বদন যার = চাঁদবদন, মীনের ম্যায় অক্ষি যার (স্ত্রী)= মীনাক্ষি।
ঘ) নঞর্থক বা নাবাচক বহুব্রীহি সমাস:
যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদটি নঞর্থক থাকে,তাকে নঞর্থক বহুব্রীহি সমাস বলে।যেমন:নাই হায়া (লজ্জা) যার-বেহায়া, নাই বোধ যার-নির্বোধ।
ঙ) সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস:
যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদটি সংখ্যাবাচক শব্দ থাকে, তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস বলে।যেমন-পঞ্চ আনন যার= পঞ্চানন (মহাদেব),আটটি চাল যার= আটচালা।
চ)ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস:
যে বহুব্রীহি সমাসে একই শব্দের দ্বিত্ব করে পরস্পর একজাতীয় ক্রিয়া করা বোঝায়,তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস বলে। ব্যাতিহারে পূর্বপদের শেষে ‘আ’ এবং পরপদের শেষে 'ই' হয়।যেমন-হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি,কানে কানে যে পরামর্শ = কানাকানি।
ছ) অন্ত্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস:
যে বহুব্রীহি সমাসে ব্যাসবাক্যের শেষ পদের লোপ হয়, তাকে অন্ত্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন:পাঁচ হাত পরিমাণ যার= পাঁচহাতি।
সমাসের প্রশ্ন উত্তর Click here
0 Comments